হাম আর হাওরের কান্না
- আপলোড সময় : ১১-০৫-২০২৬ ০৯:১৪:৪৩ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১১-০৫-২০২৬ ০৯:১৪:৪৩ পূর্বাহ্ন
রাজেকুজ্জামান রতন::>
চোখের সামনে শিশুর মৃত্যু, পাষাণের চোখেও জল এনে দেয়। বলা হয়, পৃথিবীতে সবচেয়ে ভারী কি? পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ। লাশের শেষ গন্তব্য, কবর কিংবা শ্মশানে যেখানেই হোক না কেন আর কোনো জল শুকায় না? গর্ভধারিণী মায়ের চোখের সামনে সন্তানের মৃত্যু। মা যখন অসহায়ের মতো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেন সন্তানের মৃত্যু যন্ত্রণা, তখন তার বুকফাটা যন্ত্রণাকে প্রকাশ করতে পারে এমন কোনো ভাষা নেই। কান্না তখন তার একমাত্র প্রকাশ। আর অসহায় মায়ের চোখের জল শুকায় না। করোনার পর বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত, নি¤œবিত্ত দরিদ্র পিতা-মাতারা এখন সেই ভারী লাশ বহন করছেন আর মায়েরা ঝরাচ্ছেন চোখের জল। হামের কারণে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ইতিমধ্যে ৩৫০ ছাড়িয়ে গেছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে হাম, মহামারী বললে ভুল হবে না। মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে এ পর্যন্ত ৩২ হাজারের বেশি হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিশু। চিকিৎসাসেবার প্রস্তুতি না থাকায় দেশের হাসপাতালগুলোতে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এপ্রিলের শুরুতে ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল শিশুদের ভিড়ে পূর্ণ হয়ে যায়; ভর্তি হওয়া অনেক শিশু শ্বাসকষ্টে ভুগছিল এবং অনেকেরই ছিল না নড়াচড়া করার শক্তি। হাসপাতালে শয্যাসংকটের কারণে অনেককেই মেঝেতেই চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। যে প্রশ্ন এখন তাড়িত করে তা হলো, এই মহামারী এবং শিশুমৃত্যু কি অনিবার্য ছিল? এর যন্ত্রণা ও বেদনা ভোগ করছে শিশু ও তাদের বাবা-মায়েরা, কিন্তু এর দায় কে নেবে?
হাম এমন একটি রোগ, যা এক দশক আগে বিজ্ঞানীরা নির্মূল করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু শুধু বাংলাদেশ নয়, এখন এটি অনেক দেশে নাটকীয়ভাবে ফিরে আসছে। উন্নত এবং আধুনিক দেশ বলে বিবেচিত কানাডা এবং বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ সম্প্রতি তাদের ‘হাম-মুক্ত’ মর্যাদা হারিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এ বছর এই পর্যন্ত ১ হাজার ৭০০-এর বেশি হামের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। যদিও ২০০০ দশকের শুরুতে তা ছিল মাত্র ১০০-এর মতো। মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকাজুড়েও হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এর কারণ কী? বিজ্ঞানীরা বলছেন, ক্রমবর্ধমান টিকা-অনীহা, কোভিড-১৯ মহামারীর সময় টিকাদানে বিঘœ এবং যুদ্ধ এসব কিছুই হাম ফিরে আসার কারণ। কী আশ্চর্য! কত উন্নতমানের নিখুঁত অস্ত্রের প্রদর্শনী দেখছে, বিশ্ববাসী আর হামের টিকার অভাবে মরছে আমাদের শিশুরা। বাংলাদেশের বিষয়টাই দেখা যাক! বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে গর্ব করে এসেছে আমাদের টিকাদানের হার এবং সাফল্য নিয়ে। কিন্তু ১৮ কোটি মানুষের এ দেশে এই মহামারীর মূল কারণ কী? দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থায় ঘটে গেল এক বিপর্যয়কর অবনতি। এর ফলে দেশব্যাপী টিকার সংকট দেখা দেয় এবং টিকাদানের হার নাটকীয়ভাবে কমে যায়। শুধু হামের কারণে নয়, রোগটি ছড়িয়ে পড়ার পর শিশুদের উচ্চ অপুষ্টি এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা মৃত্যুর সংখ্যাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মৃত্যুর এই দুঃখজনক ঘটনা প্রমাণ করে, দারিদ্র্য এবং অপুষ্টি হাত ধরে চলে এবং এর কারণে জনস্বাস্থ্যের অগ্রগতি কত দ্রুত ধ্বংস হতে পারে। যেকোনো রোগেই চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই বাংলাদেশে সাধারণত শিশুদের ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হতো। এ ছাড়া প্রতি চার বছর অন্তর দেশব্যাপী বিশেষ ক্যা¤েপইন চালানো হয়ে থাকে, যাতে কোনো শিশু বাদ না পড়ে এবং ৯৫ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত করা যায়। হামের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে এটা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশে শিশুমৃত্যু রোধে নানা পদক্ষেপের মতো হাম প্রতিরোধে বছরের পর বছর ইউনিসেফ এই টিকা সরবরাহ করে আসছিল, যার বেশিরভাগ অর্থায়ন করত ‘গ্যাভি’। সরকারও এতে কিছুটা অবদান রাখত।
দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা কি শুধু দান-অনুদানের ওপর নির্ভর করবে? নিজস্ব, ভূমিকা, সতর্কতা ও প্রস্তুতি কি থাকবে না। দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন কি থাকবে শুধু পরিসংখ্যানে? ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর একটি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেয়। কত আশা ছিল ছাত্র শ্রমিক জনতার! দুর্নীতি দূর হবে, সরকারের দায় ও দরদের প্রতিফলন দেখবে জনগণ। কিন্তু কী হলো? ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনূস সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা বন্ধ করে দেয় এবং উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে চলে যায়। ইউনিসেফ এই পরিবর্তনের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। সংস্থাটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, “এটি ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। আমি বারবার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছিলাম। খোদার দোহাই লাগে... এমনটা করবেন না।”
রানা ফ্লাওয়ার্স এ কথা অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে বলেছিলেন বলে জানান। সায়েন্স কমিটি এর সত্যতা জানতে চেয়েছিলেন নূরজাহান বেগমের কাছে। তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। যে দুর্নীতিবাজ আমলাদের বিরুদ্ধে মানুষের এত ক্ষোভ দেখা গেল দরপত্র প্রক্রিয়া, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে গিয়েছে এবং টিকার সরবরাহ ফুরিয়ে আসে। ফলে দেশজুড়ে টিকার অভাব দেখা দেয়। পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে মিয়ানমার সীমান্তের কাছে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে প্রথম হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়নি। পরে দ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এটি এখন বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে ছড়িয়েছে। ২৩ এপ্রিল এক তথ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করেছে যে, মিয়ানমার ও ভারতে হাম ছড়িয়ে পড়ার ‘ঝুঁকি’ রয়েছে। ডব্লিউএইচও এই প্রাদুর্ভাবকে ‘হাম নির্মূলে বাংলাদেশের আগের অগ্রগতির একটি পশ্চাদপসরণ’ বলে বর্ণনা করেছে।
স্বাস্থ্য নিয়ে যারা ভাবেন তারা অনেকে অন্তর্বর্তী সরকারের দিকে আঙুল তুলেছেন। গত ১২ এপ্রিল সুপ্রিমকোর্টের এক আইনজীবী দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনায় ব্যর্থতা ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। ইউনিসেফের বাংলাদেশপ্রধান রানা ফ্লাওয়ার্সও মনে করেন, এই ভুল সিদ্ধান্তের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
শিশুমৃত্যুর মতো বাংলাদেশের হাওরগুলোরও মৃত্যু ঘটছে যেন? আমাদের প্রধান খাবার চাল। বাংলাদেশে বছরে কতটুকু চাল লাগে? এক হিসাবে চালের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪ কোটি ২৪ লাখ মেট্রিক টন। তিন মৌসুমের মধ্যে একমাত্র বোরো মৌসুমেই দেশের মোট উৎপাদনের ৬০ ভাগ ধান জমা হয়। যার মধ্যে হাওর থেকে আসে যার ২০ ভাগ। জেলা হিসেবে দেখলে, নিজ এলাকার জন্য রেখে শুধু সুনামগঞ্জের হাওরে চাষ করা ধান জাতীয় খাদ্যভা-ারে জমা হয় ছয় লাখ মেট্রিক টন। ফালগুন থেকে বৈশাখের নানা মাত্রার বর্ষণে আজ একের পর এক তলিয়ে গেছে হাওরের এই ধানের ভা-ার। দেশের সাত ভাগের এক ভাগ হলো, সাত জেলায় বিস্তৃত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরাঞ্চল। এখানে চলতি বোরো মৌসুমে ৯ দশমিক ৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ করা হয়েছে। বৃষ্টি ও বন্যার কারণে সব ধান কাটা হয়নি, যে পরিমাণ ধান কাটা হয়েছে তাও শুকানো যাচ্ছে না। গরমে অংকুরোদ্গম হয়ে যাচ্ছে ধান। পচা ধানের গন্ধে বাতাস ভারী হচ্ছে ক্রমে। আর কৃষকের কান্না? তারা তো প্রতি বছরেই কাঁদে। প্রশ্ন জাগে একটাই, সোনা রঙের ধান নিয়ে বছরের পর বছর সব সরকারের আমলে হাওর কি এভাবেই তলিয়ে যাবে?
নদীমাতৃক বাংলাদেশে ভিন্ন প্রকার জলাধার ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যাদের মধ্যে অন্যতম হলো হাওর। বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুসারে দেশে মোট ৪১৪টি হাওর রয়েছে। তবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী হাওরের সংখ্যা ৪২৩টি। চলতি বছরের ২৭ এপ্রিল সুনামগঞ্জের লাউড়ের গড়ে ১৩৩, দিরাইতে ২০৫, ছাতকে ৭৬ ও সদরে ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। পাউবোর (২০২৫) জরিপ মতে, দেশে ১ হাজার ৪১৫টি নদ-নদীর ভেতর সুনামগঞ্জ জেলায় সর্বাধিক ৯৭টি নদী আছে; আছে বিল ও জলাভূমি। বর্ষাকালে এবং বৃষ্টির দেশে বৃষ্টি হবে, পানি গড়িয়ে বিল ও নদী হয়ে সাগরে পৌঁছে যাবে, কিন্তু পানির এত প্রাকৃতিক আধার থাকার পরও হাওরাঞ্চলে ‘জলাবদ্ধ-বন্যা’ বাড়ছে কেন? এর বিজ্ঞানসম্মত উত্তর আর ন্যায়সংগত বিচার হওয়া দরকার।
একটু নজরটা অন্যদিকে ফেরালে কিছুটা উত্তর পাওয়া যাবে। পাউবোর হিসাব থেকে দেখা যায়, ২০২৩ থেকে ২০২৬ এই তিন অর্থবছরে কেবল সুনামগঞ্জ জেলায় ২ হাজার ১৩৬টি ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে ৯৪ লাখ ৬৯ হাজার ৬৮৮ ঘনমিটার মাটি। এই পরিমাণ মাটি দিয়ে ৩ হাজারের বেশি পুকুর ভরাট করে ফেলা সম্ভব। টাঙ্গুয়ার মতো আয়তনের কোনো হাওরের প্রায় ৪ ইঞ্চি পুরু কিংবা কোনো নদীর ১০ কিলোমিটার এলাকা ভরাট করে দিতে পারে ওই মাটি। হাওর, বিল ও নদীগুলো কতটুকু ভরাট হয়েছে, পানি ধারণক্ষমতা কত কমেছে তার কি কোনো হিসাব আছে? মাটি কেটে টাকা লুটেছে একদল আর হাওর ধ্বংসে ক্ষতির শিকার হচ্ছে কোটি মানুষ।
মায়ের কোলে শিশুর মৃত্যু আর কৃষকের কষ্টের পাকা ধান, চোখের সামনে তলিয়ে যাওয়ার বেদনা, রাষ্ট্র বুঝবে না? কাদের দায়ে এমন দুঃসময় অনিবার্য হয়ে উঠে, তাদের চিহ্নিত করা হবে? তারা কি শাস্তি পাবে না? কপাল চাপড়ে হাহাকার আর কান্না কতদিন চলবে? জীবন ও জীবিকার ওপর সর্বগ্রাসী বন্ধ করতে রাজনৈতিক দায় গুরুত্বপূর্ণ দুর্নীতি, দায়হীনতা আর প্রতিকারহীন বিপর্যয়ের হাত থেকে মানুষকে মুক্ত করার সংগ্রাম জরুরি।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক